1. newsbhorerdhani@gmail.com : admi2017 :
বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ বাঞ্ছারামপুর আসনে চতুর্মূখি লড়াইয়ের আভাস  আইয়ূবপুর ইউনিয়নে মাতাল মার্কা”-র বিশাল মিছিল অনুষ্ঠিত দাড়িপাল্লা প্রতিকের পক্ষে বাঞ্ছারামপুরে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ মহসিনের গণমিছিল যুবসমাজকে মাদক থেকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার করেন সুবিধাবাদী রাজনীতির বাইরে মোমবাতি প্রতীকই নিরাপত্তার বার্তা : ইসলামী ফ্রন্ট মহাসচিব স.উ.ম আব্দুস সামাদ ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র ছাড়া রাষ্ট্র টিকতে পারে না : জোনায়েদ সাকি নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় দেশে কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার-কুমার, খেতমজুর ও দিনমজুর মানুষদের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে জোনায়েদ সাকি উন্নত, নিরাপদ ও মানবিক বাঞ্ছারামপুর গড়তে মাথাল মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনী জনসভা

নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২২ ৮০.০০০বার

নিজস্ব প্রতিবেদক
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই আজিমপুর সরকারি কলোনি থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় পর্যন্ত একের পর এক প্রকল্পে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, অভ্যন্তরীণ নথি, প্রকৌশলীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট, দরপত্র কারসাজি, নিম্নমানের কাজ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দায়মুক্তির একটি সুসংগঠিত চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে কর্মকর্তাদের জন্য নির্মাণাধীন বহুতল মেকানিক্যাল কার পার্কিং শেড প্রকল্পটি এই অনিয়মের একটি বড় উদাহরণ। প্রকল্পটির জন্য ডিপিপিতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৭২ কোটি টাকা। নকশা অনুযায়ী এখানে ১২ তলা স্টিল স্ট্রাকচারের একটি পার্কিং ভবনে ২৮৮টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে অনুমোদন ছাড়াই পার্কিংয়ের ধারণক্ষমতা কমিয়ে ২৪০টিতে নামিয়ে আনা হয়। এর ফলে প্রায় ১১ কোটি টাকা সাশ্রয় হলেও সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে আত্মসাতের আয়োজন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পওবিপ্র) মো. শফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিতে সদস্য সচিব ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস এবং সদস্য ছিলেন আশেক আহমেদ শিবলী। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ডিপিপি থেকে ব্যত্যয় ঘটিয়ে পার্কিংয়ের ধারণক্ষমতা হ্রাস করা সমীচীন হয়নি এবং এটি স্থপতির এখতিয়ারবহির্ভূত। ন্যূনতম প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির অনুমোদন নেওয়া উচিত ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ধারণক্ষমতা কমানোর ফলে যে অর্থ সাশ্রয় হয়েছে এবং স্থাপত্য অধিদপ্তরের ভেটিংকৃত নকশা ও শর্ত প্রতিপালনের জন্য যে অবশিষ্ট কাজগুলোর প্রস্তাব সংশোধিত ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা অনুমোদনের আগেই দ্রুত কাজ শেষ করার অজুহাতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও চুক্তি সম্পাদন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় একাধিক স্তরে নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পার্কিং শেডের রং করা ও কভার তৈরির কাজের জন্য আলাদা দুটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। অথচ এই কাজগুলো প্রকল্পের মূল কাজের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে একই কাজ দুইবার দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই অতিরিক্ত বরাদ্দকৃত অর্থ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রকল্প পরিচালক এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠালেও কোনো জবাব পাননি।

আজিমপুরের এই প্রকল্পই একমাত্র নয়। এর আগেও একই এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে তানভীর আলমের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। আজিমপুর ও মতিঝিল সরকারি কলোনিতে মোট ৬৮টি লিফট স্থাপনের টেন্ডারেও গুরুতর কারসাজির অভিযোগ রয়েছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী লিফট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ২০ বছরের উৎপাদন অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা যেমন টিইউভি বা ডিএনভি থেকে সার্টিফিকেশন থাকতে হবে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও রওশন এলিভেটরস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘যোগ্য’ ঘোষণা করা হয়।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, রওশন এলিভেটরসের ইতালীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মোভিলিফট’ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০০ সালে এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ উৎপাদন শুরু করে ২০০৫ সালে। অর্থাৎ, দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল। তবুও যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের দরপত্রকে প্রাথমিকভাবে রেসপনসিভ ঘোষণা করা হয়, যা সরকারি ক্রয়বিধির সরাসরি লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আজিমপুর নতুন কলোনিতে রক্ষণাবেক্ষণ খাতেও ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে এই খাতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ কলোনির বেশিরভাগ ভবন তিন বছরের বেশি পুরোনো নয়। নতুন ভবনে বৈদ্যুতিক রক্ষণাবেক্ষণের বড় কোনো প্রয়োজন থাকার কথা নয়। কিন্তু নথিতে দেখা যায়, বহু ভবনের নামে বৈদ্যুতিক কাজের বিল দেখানো হয়েছে, যেসব ভবনের বাস্তব অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এমনকি যেসব বাসার নামে বিল করা হয়েছে, সেসব বাসিন্দারাও কোনো কাজ হওয়ার কথা জানেন না বলে জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, আজিমপুরে দায়িত্ব পালনকালে নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আলম একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের চাপে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তাকে আজিমপুর থেকে সচিবালয়ে বদলি করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, তিনি নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করে এক মাসেরও বেশি সময় একসঙ্গে দুটি ডিভিশনের দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি আদেশ অনুযায়ী দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ শেষ না করে বিল ছাড় করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে দুটি সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি সুবিধা ব্যবহার করাও ছিল নিয়মবহির্ভূত।

সচিবালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থেমে থাকেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সচিবালয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বৈদ্যুতিক স্পার্ককে আগুনের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেকের ধারণা, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সামগ্রী ও দুর্বল সংযোগ ব্যবহারের কারণেই এই আগুন লাগে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থানে তানভীর আলমের তত্ত্বাবধানে কীভাবে নিম্নমানের পণ্য ব্যবহার করা হলো, সে প্রশ্নের জবাব আজও মেলেনি।

তানভীর আলমের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার চাচা বাগেরহাট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও খুলনার সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক এবং পারিবারিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দায়মুক্তি পেয়ে আসছেন। ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনার সূত্রে গণপূর্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও তার প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ।

দুর্নীতির টাকায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় নিজের নামে ফ্ল্যাটসহ অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে বারবার গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলম গণমাধ্যমকে বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি অবগত নন এবং ডিপিপিতে অনুমোদিত কাজই তিনি করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে তিনি তার বক্তব্য দেবেন বলেও জানান।

তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন, নথিপত্র ও প্রত্যক্ষ অভিযোগ থাকার পরও কেন এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? কেন বারবার একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠে এলেও অভিযুক্ত প্রকৌশলী বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন তাকিয়ে আছে দেশবাসী।

রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নইলে আজিমপুরের পার্কিং শেড থেকে সচিবালয়ের অগ্নিকাণ্ড—সবই থেকে যাবে অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2015 দৈনিক ভোরের ধ্বনি পত্রিকা
Theme Customized By BreakingNews